৬ শতাংশের কাছাকাছি ব্যাংক স্প্রেড

ব্যাংক খাতে অদক্ষতা ও সুশাসনের অভাবকে নির্দেশ করছে

ব্যাংকগুলো বর্তমানে আমানতকারীদের যে হারে সুদ দিচ্ছে, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে তার চেয়েও বেশি হারে। ফলে আমানত ও ঋণের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান (ব্যাংক স্প্রেড) ক্রমেই বাড়ছে।

ব্যাংকগুলো বর্তমানে আমানতকারীদের যে হারে সুদ দিচ্ছে, ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে তার চেয়েও বেশি হারে। ফলে আমানত ও ঋণের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান (ব্যাংক স্প্রেড) ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের ব্যাংক খাতের বিদ্যমান গড় স্প্রেড গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালের মার্চেও গড় স্প্রেড ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে এখন তা ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশে ঠেকেছে। আর কিছু ব্যাংকের স্প্রেড বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশে।

এমন অস্বাভাবিক হারে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বেড়ে যাওয়া মূলত ব্যাংক খাতের অদক্ষতাকে প্রতিফলিত করছে। সেই সঙ্গে এ খাতে যে এখনো সুশাসন বা আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিগত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাতে যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চলেছে তাতে এর প্রতি আস্থা হারিয়েছে জনগণ। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছাড়া প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ঠেকেছিল পুরো ব্যাংক খাত। ভাবমূর্তি সংকটে থাকা বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলো বর্তমানে তাদের আমানত প্রবৃদ্ধিতে আমানতের ওপর সুদহার বাড়িয়েছে, কিন্তু অনাস্থার কারণে তাতে আশার আলো দেখছে না। অন্যদিকে ভালো ব্যাংকগুলোয় অনেক কম ৪-৬ শতাংশ সুদেও গ্রাহকরা টাকা জমা রাখছেন। এতে ভালো ব্যাংকগুলোর আয়ে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। আর দুর্বল ব্যাংকগুলো সংকটের মধ্যেই পড়ে রয়েছে।

ব্যাংক স্প্রেডের এ পরিস্থিতি ব্যাংক খাত পরিচালনায় অদক্ষতার ফসল। সেই সঙ্গে এখনো সুশাসনের নিশ্চিত করে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়নি। যে সুযোগ লুফে নিচ্ছে মুষ্টিমেয় ব্যাংক। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও জনগণের ওপর।

যে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান যত বেশি, তাদের মুনাফাও তত বেশি। ওই ব্যাংকের জন্য এ মুনাফা লাভজনক হলেও দেশের মানুষ ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এটি উদ্বেগজনক। কারণ স্প্রেড বৃদ্ধির অর্থ হলো আমানতকারীদের লাভ সীমিত এবং ঋণগ্রহীতারদের ওপর বাড়তি সুদের চাপ রয়েছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হয়ে আসে। অন্যদিকে বাড়তি সুদে ঋণ নিয়ে উৎপাদন করা হলে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন পর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যার ভার বহন করতে হয় ভোক্তাদের। অর্থাৎ মূল্যস্তর স্ফীতি করে তোলে ঋণের বাড়তি সুদহার। আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যাংকগুলো আমানত আকৃষ্ট করতে আমানতের সুদহার বাড়িয়ে দিলে তাদের মুনাফার মার্জিন কমে আসে। কিন্তু যদি সে ব্যাংকের প্রতি মানুষের অনাস্থা থাকে তাহলে বেশি সুদ দিয়েও ওই ব্যাংক আমানত প্রবৃদ্ধিতে ব্যর্থ হয়। এতে ব্যাংকটি আরো দুর্বল হতে থাকে। বিপরীতে মুষ্টিমেয় ব্যাংক আমানতের ওপর কম সুদ দিয়ে বেশি আয় করার অবারিত সুযোগ পেয়ে যায়, যা আমানতকারীদের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ও মূল্য স্তরের চিত্র বর্তমানে এমন। দীর্ঘকাল ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, দুই অংকের ঘরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশে। এর আগের মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৩৫। আর ব্যাংক খাতে সুশাসন ও আস্থার অভাব এখনো তীব্র রয়েছে।

এমন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেশের ব্যাংক খাতে স্প্রেড বেড়ে যাওয়াটা সার্বিকভাবেই উদ্বেগজনক। অর্থনীতির গতি ও জনগণকে স্বস্তি দিতে হলে আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। এ ব্যবধান কমাতে হলে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনা অতীব জরুরি। সেই সঙ্গে আমানতের সুদহারের সমন্বয়ও করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে তৎপর হতে হবে। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক স্প্রেড ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেন তার পরিপালন হচ্ছে না, সে বিষয়ে প্রয়োজনে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। একই সঙ্গে যে কারণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেয়া হয়েছিল বা এটি বাজারভিত্তিক করা হয়েছিল সেই লক্ষ্য কতটুকু অর্জন হলো সেটিও বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের পর্যালোচনা করা দরকার।

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ২০২০ সালের এপ্রিলে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছিল সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরই স্প্রেড কমতে শুরু করে। ২০২০ সালের মার্চে ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। সুদহার বেঁধে দেয়ায় পরের বছরের একই সময়ে এসে তা ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২২ সালের মার্চে এসে গড় স্প্রেড দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১০ শতাংশে। আর ২০২৩ সালের মার্চে আরো কমে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান ২ দশমিক ৯৬ শতাংশে নেমে যায়। কিন্তু এরপর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ২০২৩ সালে ঋণের সুদহারের সীমা তুলে দেয়া ও ২০২৪ সালে তা বাজারভিত্তিক করায় বেড়ে দাঁড়ায় আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান। যদিও এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এতে কেবল আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকটের সমাধানও হচ্ছে না। ভাবমূর্তি সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে আমানত তুলে নিয়ে রাখা হচ্ছে ভালো ব্যাংকগুলোয়, যেখানে ঋণের সুদহারের চেয়ে আমানতের সুদহার প্রায় অর্ধেক। এতে ভালো ব্যাংকগুলোর মুনাফায় উল্লম্ফন ঘটলেও দুর্বলগুলো লোকসানে পড়ছে। আর বাড়তি সুদের চাপে ভালো ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণের সুদহার ও স্প্রেড বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে দেশে সততার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে তাদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে তারা ১৪ শতাংশ সুদ দিয়েও ঋণ পাচ্ছেন না।

এদিকে ব্যাংক খাতের গভীর ক্ষতই হলো খেলাপি ঋণ। একদিকে গত দেড় দশকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ এখন আর ফিরে আসছে না। অন্যদিকে সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে খেলাপি ঋণও বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকায়। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে। তবে খেলাপি ঋণের এ হার ৩০ শতাংশেরও বেশি হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একাধিকবার আভাস দেয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংক স্প্রেডের ঊর্ধ্বমুখী ব্যবধান দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান সংকট সমাধানকে আরো কঠিন করে তুলছে। এটি যত দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে ততই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে অর্থনীতিতে। বিগত সময়ে কেবল ঋণের সুদহার বেড়েছে, আমানতের সুদহার বাড়েনি, এমন নয়। তবে যে গতিতে ঋণের সুদহার বেড়েছে সে গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি আমানতের সুদহার। এমন অবস্থায় সার্বিকভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমছে না। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরও